গ্যাস সিলিন্ডার যেন ‘মৃত্যুদূত’

বাসাবাড়িতে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এতে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ। কোনো কোনো ঘটনায় পুরো পরিবারই ধ্বংস হয়ে গেছে। দগ্ধদের দুয়েকজন সুস্থ হলেও পঙ্গুত্ববরণ করে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। ভুক্তভোগীদের কাছে গ্যাস সিলিন্ডার আবির্ভূত হচ্ছে ‘মৃত্যুদূত’ হয়ে। তবে গ্যাসের আগুনের এমন মর্মন্তুদ দুর্ঘটনার দায় নিচ্ছে না কেউ। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা হলেও কারো সাজা পাওয়ার পরিসংখ্যান নেই পুলিশ সদর দপ্তরে। তদারক সংস্থা এর জন্য ব্যবহারকারীর অসচেতনতাকেই দায়ী করেছেন। তবে শুধু অসচেতনতাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ, মানহীন সিলিন্ডার তৈরি ও সরবরাহ, সিলিন্ডারের সঙ্গে চুলার সংযোগ পাইপ সঠিক ফিটিংস না হওয়া এবং নিয়মিত মনিটরিং না করাকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতি মাসে ৫০০ জন আগুনে পোড়া রোগী বার্ন ইউনিটে ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে ৪২ শতাংশই গ্যাসের আগুনে দগ্ধ। প্রতি মাসে আগুনে পোড়া প্রায় ১০০ রোগী মারা যাচ্ছেন। দগ্ধ বাকিরা সুস্থ হলেও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। এ বিষয়ে ঢামেক বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামান্ত লাল সেন বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের ঘটনা সংক্রামক ব্যধির মতো বেড়েই চলছে। এখনই যদি এর লাগাম টেনে ধরা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটা মহামারী আকার ধারণ করবে।
তিনি বলেন, সাধারণ আগুনের চেয়ে গ্যাসের আগুন অনেক বেশি ভয়াবহ। গ্যাস সিলিন্ডার বা চুলার পাইপের লিকেজ থেকে সারা রাত গ্যাস জমে জমে ঘর ভরে যায়। সকালে চুলা ধরানোর জন্য দিয়াশলাই জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে আগুনের গোলা তৈরি হয়। আগুনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি মারাত্মক দগ্ধ হন। সাধারণত গ্যাসের আগুনে রোগীর শ্বাসনালি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারী, বাড়ির মালিক, এলপিজি গ্যাস কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ভোরে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গিলারচালা গ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সেলিনা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে তার ৯ বছর বয়সী মেয়ে জান্নাত। এর আগে গত ১৯ ফেব্রয়ারি ভোরে খাগড়াছড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ২ জন মারা যান। ২৫ জানুয়ারি নড়াইলে গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে ৮ জন আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কয়েকজন। গত ১৬ নভেম্বর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে সিলিন্ডারের গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজনসহ ৬ জন দগ্ধ হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ জন মারা যান। ৬ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের একটি বাসার গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে দগ্ধ হয়ে সাইফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সাজেনা আখতার দগ্ধ হয়ে মারা যান। গত ২ নভেম্বর আশুলিয়ায় আবদুর রবের বাসায় গ্যাসের পাইপলাইনে বিস্ফোরণের পর লাগা আগুনে দগ্ধ হয়েছিলেন আবদুর রবসহ তার পরিবারের পাঁচ সদস্য। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ৪ জনের। এর আগে ১৩ অক্টোবর উত্তরখানের বাসায় গ্যাসের চুলার আগুনে দগ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম বলেন, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে পরীক্ষা করা হয় না। মানসম্মতভাবেই সিলিন্ডারগুলো তৈরি করা হয় দাবি করে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখ লোক এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে। এতে প্রায় ২ কোটি সিলিন্ডার প্রয়োজন।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে না দাবি করে তিনি বলেন, চুলার সঙ্গে সিলিন্ডারের সংযোগ পাইপে লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো অনুসন্ধানে দেখেছি, ব্যবহারকারীদের অসাবধানতা ও অসচেতনতাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া ও নড়াইলের দুর্ঘটনাগুলোর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্ফোরণে ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে গেছে। কিন্তু সিলিন্ডার ও চুলা অক্ষত আছে।
তিনি জানান, সিলিন্ডারের মুখে রেগুলেটর লক হয়ে একটি রাবারের সিল চেপে থাকে। ব্যবহারকারীরা চুলার সুইচ বন্ধ করলেও অজ্ঞতার কারণে রেগুলেটরের সুইচ বন্ধ করেন না। যার কারণে সিলিন্ডারের গ্যাস বের হয়ে রাবারের সিলে চাপ সৃষ্টি করে এবং লিকেজ হয়ে গ্যাস বের হয়ে ঘরে জমতে থাকে। সকালে রান্নার জন্য চুলা জ্বালাতে গেলে ঘরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের গোলা তৈরি হয়। তখন আশপাশে থাকা সবাই মারাত্মক দগ্ধ হন। এ জন্য এলপিজি গ্যাস ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আমরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং রেডিও-টেলিভিশনে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটলে থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। পরবর্তীতে অপরাধের আলামত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি বলেন, সব দুর্ঘটনাই অপরাধ না। তবে গ্যাস সিলিন্ডার অরক্ষিতভাবে বসানোটা একটা অপরাধ। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারো সাজা হওয়ার পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী বলেন, মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার তৈরি, ব্যবহারকারীর অসচেতনতা, চুলার সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডারের সংযোগকারী ব্যক্তির অনভিজ্ঞতা, নিয়মিত মনিটরিং না করার কারণে গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটছে।
পৃথিবীর সব দেশেই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার হলেও দুর্ঘটনা তেমন হয় না উল্লেখ করে অধ্যাপক মাকসুদ হেলাল বলেন, বিদেশে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা অনেক বেশি। আমাদের দেশে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে চুলা পর্যন্ত লাগানো পাইপগুলো মানসম্পন্ন না। বাজার থেকে যে কেউ পাইপ কিনে চুলার সঙ্গে সিলিন্ডারের সংযোগ দিচ্ছেন। পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারীরাও এ বিষয়ে সচেতন নন।
ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ জানান, মানুষ একটু সচেতন হলে আগুন থেকে অনেকটাই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। গ্যাস পাইপ কিংবা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে গ্যাস বের হলে শব্দ এবং পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধ ছড়াবে। এ ধরনের গন্ধ পাওয়ামাত্র জানালা দরজা খুলে গ্যাস বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email
×

সারা বাংলা সারা দিন-এর সাথেই থাকুন!