বান্দরবান যাত্রা

অনেকের মতে দেশের সবচেয়ে সুন্দর জেলা বান্দরবান। আমার মতেও তাই। জেলাটির যত গহীনে যাওয়া যায় ততই মুগ্ধ হতে হয়। কি অপরূপ, কি সুন্দর! নীলগিরি, নীলাচল, স্বর্ণমন্দির কিংবা প্রান্তিক লেক দেখে অনেকেই বলে, বান্দরবান ঘুরেছি। কিন্তু আদতে আপনি জেলাটির কিছুই দেখেননি।

আজ আপনাদের শোনাবো বান্দরবানের অনিন্দ্য সুন্দর শঙ্খ যাত্রার গল্প। থানচি উপজেলার সর্ব দক্ষিণ-পূর্বের গ্রাম লাগপাই পাড়া (বুলু পাড়া) থেকে কয়েক ঘণ্টা হাঁটাপথে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মদক রেঞ্জের বাংলাদেশীয় অংশে, কোনো এক প্রাকৃতিক জল নিষ্কাশন ক্ষেত্র থেকে শঙ্খছড়ার গোড়াপত্তন। এই ছড়া ধরে শুরু হয় এই শঙ্খ নদীর যাত্রা। মদক রেঞ্জের এই মাতৃঝিরি ছাড়াও ঠিক বিপরীত পাশের আরো কিছু ছোট ঝিরি মিলে লাগপাই পাড়া এসে পৌঁছায়।

পাশেই লাগপাই ঝিরি, এটিও শঙ্খের যাত্রায় সামিল হয়। এখানে বেশিরভাগ মুরং আদিবাসীরাই বসবাস করে। পাড়ার লোকজনদের আত্মীয়তা সীমারেখা পেরিয়ে যায় কারণ পাড়াটির তিন দিকেই মিয়ানমার। নিকটবর্তী বাজার সীমারেখার বাইরে। কিন্তু সঙ্গে রয়েছে চেনা সব বিপদ, তাই একদিনের হাঁটাপথের লিক্রি পাড়াই উত্তম। প্রায়শই যেতে হয় ৩/৪ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে সুদূর মদকে, থানচি তো আয়ত্বের সীমা পেরিয়ে। জীবিকা বলতে ঐ জুম, আমিষ বলতে শিকার ও সামান্য কিছু গবাদী পশু পালন।

চিকিৎসার জন্য বিজিবি ছাড়া অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য পথ নেই। পাড়াটি এতটাই দুর্গম যে বিজিবিদের রেশন হেলিতে পৌঁছায়। একে বান্দরবানের সর্ব দক্ষিণের পাড়া হিসেবে জানা গেলেও প্রায় বছর হয়ে গেছে আরো দক্ষিণে বুলুপাড়া থেকে ৫/৬টি পরিবার নিয়ে আরেকটি পাড়া (নয়া পাড়া) গড়ে উঠেছে। বুলুপাড়া, পানঝিরি পাড়া, তাংখোইপাড়া, নয়াপাড়া এই চারটি পাড়ার লোকজনের বুলুপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের অধিকারিদের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক। পাড়ার লোকজনদের সুখে-দুঃখে তারা চিকিৎসা সহ সম্ভাব্য বিভিন্ন সুবিধা দান করে থাকেন।

সাংগু রিজার্ভ ফরেস্ট এরিয়া এক রহস্য ঘেরা অঞ্চল। এই অঞ্চলে দুর্লভ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ বন্য প্রাণী, পাখি, সাপ, কচ্ছপ, বনরুই, হরিণ, বানর, মেছোবাঘ, ভাল্লুক আর রয়েছে হাতির আধিক্য। তাই হয়তো পাড়া থেকে উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে ত্রিভুজ আকৃতির মদকরেঞ্জের সর্বশেষ উচু পাহাড়, নাসাইহুম/হাতিপাহাড় (৩,০০৫ ফুট) দেখা যায়।

আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে মুরং/ম্রো সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী আধুনিকতা আর যান্ত্রিক কোলাহলময় পৃথিবী ছেড়ে নিজেদের সংস্কৃতি লালনে বেশী ব্যস্ত। বসবাস করেন দুর্গমতম পাড়াগুলোতে বা একটু গহীনে। এই পাড়া এবং আশপাশের সব পাড়াই মুরংপাড়া। বুলু কারবারির (গোত্রের প্রধান) ঘরে একটি দিন কাটিয়েছিলাম, এ যেন সংগীত শালা। বাঁশ-কাঠ-লাউ দিয়ে বানানো আজব সব বাদ্যযন্ত্র। সত্যিকারের ফোক মিউজিক বলা চলে! যা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করাতে বুলু দা জানালেন, একদিন আগে নাকি তাদের বিরাট এক উৎসব শেষ হল, যাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পাড়ার লোকজন, দুর-দুরান্ত থেকে এসে মিলিত হয়েছেন।

কিছুক্ষণ পর ফিরে আসলেন পাড়ায় একদল যুবক, ঝুড়ি আর গামলাসহ। খুব আগ্রহের সাথে দেখতে গেলাম, কী আনলেন শিকার করে। পাড়ার সকল ছোট-বাচ্চাগুলোও আরো অধিক আগ্রহে ছুটে গেলো! দেখলাম, তারা প্রচুর পরিমাণে মৌচাক সমেত মধু নিয়ে আসলেন, বাচ্চারা হাত বাড়ালো সাথে আমিও। আহা.. আজীবন মধুর ঐ স্বাদ ভুলবার জো আমার নেই।

চুলায় গলিয়ে আর হাতে চেপে বোতল ভর্তি করছিলেন, কিন্তু ভরপুর খাওয়া-দাওয়ার পর। হয়তো বিক্রি করবেন, আমিও এক বোতল নেয়ার সুযোগ ছাড়িনি। মধুর গরম নিবারন করতে, হাটুজল সাংগুতে নেমে পড়ি রাত ৮টায়। চাঁদের অকৃপণ আলোর বর্ষণে প্রশান্ত শরীরে, রাজ্যের অধিপতির সুখ অনুভূত ছিলো, তন্দ্রা নিমেষে ইশারা করছিলো। দূরের কোনো সিংহাসন থেকে ‘রাজধনেশ’ ডেকে ডেকে তার উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলো। কিন্তু ‘এনোফিলিস’ মশার ভয়ে আমি আমার সিংহাসন ছেড়ে রাতের ডেরায় ফিরলাম।

রাতের ভোজে নানান পাহাড়ি সবজি, মাছ, জুমের ভাত খেয়ে আরেক দফা আড্ডা মেরে, চোখ বন্ধ করে ভাবি, জীবন নেহায়েত মন্দ না এখানে।

যেতে চাইলে

বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে থানচি। থানচি পৌঁছে লোকাল গাইডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পুলিশ ক্যাম্পে নাম উঠিয়ে নেবেন। এবং অনুমতি পত্র দেখিয়ে সাংগু নদী অনুসরণ করে রুট প্লান তৈরি করে নিতে হবে। এই মুহুর্তে এই রুটটি সর্ব সাধারণের জন্য বন্ধ করা আছে। তবে সেনাবাহিনি ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ থেকে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে এই রুটে ভ্রমণ করতে পারবেন।

Print Friendly, PDF & Email
×

সারা বাংলা সারা দিন-এর সাথেই থাকুন!