মিঠামইন উপজেলার পাঁচ জয়িতার গল্প

মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ।
নাদিরা আক্তার এর জীবন কাহিনী :

নাদিরা আক্তার, পিতা-মোঃ টিটু মিয়া, মাতা-মারজানা বেগম, গ্রাম-কুলাহানি, পোঃ ঢাকী, উপজেলা-মিঠামইন, জেলা-কিশেরগঞ্জে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পরিবারের সদস্য সংখ্যা ০৬। বাবা একজন দিন-মজুর। সংসারে প্রায় সবসময় অভাব অনটন অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। এভাবে তারা কোন দিন খেয়ে আবার না কোন দিন না খেয়েও দিন চালাতো। অভাবের সংসারে ভালোভাবে লেখাপড়া করার সুযোগও ছিল না। তার পড়েও সে অনেক চেষ্টা করে এস.এস.সি পাশ করে এরপর সে কলেজে ভর্তি হতে চায় কিন্তু তার পরিবার সদস্য কেউ রাজি হয় না। এর মধ্যেই তার বাবা পাশের গ্রামের এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করে প্রথমে সে এই বিয়েতে অমত পোষণ করে কিন্তু পরে সে পরিবারের চাপে বিয়েতে রাজি হতে হয়। বিয়ে হবার পর কিছুদিন ভালই চলতে ছিল। কিন্তু একসময় হঠাৎ করে তার স্বামীর মধ্যে ও শশুড় ও শাশুড়ীর পরিবর্তন দেখা দেয় কথায় কথায় তার স্বামী গালিগালাজ করে এবং বাবার বাড়ী থেকে টাকা পয়সা আনার জন্য মারীরিক ও মানসিবখাবে নির্যাতন করতে থাকে এবং নির্যাতনের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এক পর্যায়ে নাদিরার গর্ভে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কন্যা সন্তান জন্ম হওয়ার পর থেকে অত্যাচার আরও বাড়তে থাকে অবশেষে তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয়। তালাকের পর থেকে নাদিরার জীবন আরও বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। নাদিরা হতাশার মধ্যে পড়ে যায়। এরপর নাদিরা চিন্তা করল যে তার মেয়ের জীবনও তার মতই কষ্টের হবে। এরপর নাদিরা নিজে কিছু করতে চায়। নাদিরা বর্তমানে একটি বেসরকারী পপি সৌহাদ্য এনজিও তে চাকুরী করছে। কিন্তু এই চাকুরীর বেতনে খরচ শেষে সঞ্চয় করার মত টাকা থাকে না। তখন নাদিরা পাশের গ্রামের মহিলার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ শিখে চাকুরির পাশাপাশি সেলাই কাজও করতে শুরু করে প্রতিদিনি ২৫০ টাকা করে হলেও ৭৫০০/- টাকা এবং চাকুরির বেতন মিলে প্রতিমাসে তার ১০০০০/- টাবা আয় হয়। নাদিরা তার সংসারের খরচ ও বাচ্চার খরচ যোগানোর পর আস্তে আস্তে কিছু টাকা জমা করতে থাকে এক পর্যায়ে বেশ কিছু টাকা জমা হলে একটি গরু ও একটি ছাগল ক্রয় করে। বর্তমানে নাদিরার ৫টি ছাগল ও বাচ্চা সহ দুটি গাভী আছে। নির্যাতনের বিভিষিকাময় মুছে ফেলে তিনি বর্তমানে ভালো আছেন। মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে মাথা উচু করে দাড়াবার স্বপন্ন দেখেন। তিনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে প্রচার ও প্রচারনা চালিয়ে থাকেন।

মোছাঃ রোহেনা খাতুন এর জীবন কাহিনী
নাম ঃ মোছাঃ রোহেনা খাতুন
স্বামীর নাম ঃ মোঃ গিয়াস উদ্দীন
মাতার নাম ঃ জামিনা খাতুন
গ্রাম-মহিষারকান্দি, ডাকঘর-ইউনিয়ন+উপজেলা মিঠামাইন।
জেলা-কিশোরগঞ্জ।
সার্থক জননী রোহেনার চোখে আজ আনন্দের উচ্ছাস
কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি গ্রামের অধিবাসী। রোহেনা তিন সন্তানের জননী। রোহেনার স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করে কোন রকম সংসার চালিয়ে যান। তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। স্বামীর আয়ে কোন রকম খেয়ে না খেয়ে জীবন জীবন নির্বাহ করে আসছে। এত অভাব-অনটনের মাঝে রোহেনার স্বপ্ন হল তার সন্তানদের পড়া লেখা করানো। রোহেনা নিজে লেখাপড়া শিখেনি, তাই তার মধ্যে প্রবল ইচ্ছা জাগে তার সন্তানদেরকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করবে। রোহেনার বড় মেয়ে, তানজিনা আক্তার, তমিজা খাতুন সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হইতে ২০১৬ইং সালে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হ ক সরকারী কলেজ থেকে ২০১৮ইং সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্ত হন। বর্তমানে ২০১৯ইং সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গণিত বিভাগে অধ্যয়ন করছে। বাকী ০২ মেয়ের মধ্যে পান্না তমিজা খাতুন সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে এবং ছোট মেয়ে জিনাত মহিষারকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। রোহেনা খাতুন বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আজ তার মেয়েদেরকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছে। তার এই অদম্য ইচ্ছার নিকট দারিদ্রতা হার মেনেছে সে তার এলাকায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে এবং গ্রামের সবাই এখন তাকে নিয়ে গর্ভবোধ করে। এছাড়াও নারীর ক্ষমতায়নে যৌতুক, বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন, গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি, সন্তান পরবর্তী পরিচর্যা ইত্যাদি কর্মকান্ডে জড়িত আছেন। পরিশেষে বলা যায় “সার্থক জননী রোহেনার চোখে আজ আনন্দের উচ্ছ¡াস।
হাছিনা সুলতানা এর জীবন কাহিনী

হাছিনা সুলতানা, স্বামী-মোঃ নূরুল ইসলাম সিদ্দিকী, গ্রাম-কাজীপাড়া, ডাকঘর-মিঠামইন, উপজেলা-মিঠামইন, জেলা-কিশোরগঞ্জ। তার বয়স ৫০ বৎসর বর্তমানে তিনি কাজীপাড়া সরকারী বিদ্যালয়, মিঠামইন কিশোরগঞ্জ এ প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন। তিনি অল্প অল্প বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বয়স হওয়ার আগেই পরিবারের সম্মতিতে তাকে বিবাহ করতে হয় এবং তখন মেয়েদের পড়ালেখা করার সুযোগ ছিল না বললেই চলে কিন্তু শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকার দরুন তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান। বিয়ের কিছুদিন পরে ০১ ছেলে ০৬ মেয়ে সহ মোট ০৭ সন্তানের জন্ম হয়। একদিকে সংসার, স্বামী-সন্তান সামলিয়ে পড়ালেখা করা ছিল খুবই কষ্ট সাধ্য তথাপি তিনি হাল ছাড়েননি। তার স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হয়। এক সময় এ নিয়ে তাদের দাম্পত্য জীবনে কলহ সৃষ্টি হয়।

তিনি সকল কিছু অগ্রাহ্য করে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতেন এবং নিজের পায়ে দাড়ানোর জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই এটা তিনি সমসময় উপলবদ্ধি করতেন। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে থেকেও তিনি সর্বশেষ বিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৮/১১/১৯৮৭ সালে তিনি কেওয়ারজোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরি লাভ করেন। পরবর্তী ২০/০৬/২০১০ সালে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি লাভ বর্তমানে কাজীপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। তিনি তার প্রত্যেক ছেলেমেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে এবং নিজে নানাবিধ প্রতিকুলতার মধ্যে তার এই শিক্ষা অর্জন এবং শিক্ষকতার জন্য তাকে সফল বলা যেতে পারে।
এছাড়াও তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি বাল্য বিবাহ, যৌতুক, ইভটিজিং, গর্ভবতী মায়েদের প্রসব পরবর্তী পরিচর্যা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে প্রচারনা ও কাজ করে যাচ্ছে।

উম্মে খায়ের চৌধুরী প্রভার জীবনকাহিনী

উম্মে খায়ের চৌধুরী প্রভা, পিতা-সাইফুল রেজা চৌধুরী, গ্রাম-কেওয়ারজোড়, পোঃ কেওয়ারজোড়, উপজেলা-মিঠামইন, জেলা-কিশোরগঞ্জ। তার বয়স ৩০ বছর এবঙ তিন বোন ও এক ভাই এর মধ্যে প্রথম। তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত আছেন বিধায়, তিনি একটি সংগঠন গড়ে তোলেন “বৃক্ষছায়া সমাজ কল্যাণ সংগঠন” মিঠামইন, কিশোরগঞ্জ ও “ভাটির গর্ব কেওয়ারজোড় ইউনিয়ন” নামে সংগঠন গড়ে তোলেন সংগঠন দুটি পরিচালনা করেন তিনি নিজেই। এই সংগঠনে প্রয় ২০০ জন সদস্য আছে। এ সংগঠনের মাধ্যমে প্রভা ও তার সদস্যরা সমাজে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে থাকে।
১। প্রথমে বাল্য বিবাহ দিয়ে শুরু করেছিলেন। ১৩ বছরের একটি মেয়ের বিবাহ বন্ধ করে বর্তমানে সংগঠন থেকে একটি সেলাই মেশিন দিয়ে তাকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এমন আরো অনেক বাল্য বিবাহ বন্ধ করা হয়।
২। তাছাড়া আরো তিনজন অসহায় লোককে ব্যবসা দেওয়া হয় আমাদের “বৃক্ষছায়া সমাজ কল্যাণ সংগঠন” থেকে তারা এখন পিঠার ব্যবসা করে ভালোভাবে দিন যাপন করে।
৩। এছাড়া রমজান মাসে অসহায় রোজাদার ব্যক্তিদের ইফতারি করার ব্যবস্থা করা হয়।
৪। এমনকি বিভিন্ন নারী নির্যাতনমূলক অপরাধ বন্ধ করেছি।
৫। ঈদে অসহায় ছেলেমেয়েদেরকে কেনাকাটা ও খাবারের ব্যবস্থা করে থাকি।
৬। এমনকি বাড়ি বাড়ি গাছ লাগানোর অভিযান চালাই। তছাড়াও টয়লেট থেকে এসে যেন সবাই হাত ধৈৗত করে, সে জন্য বাড়ি বাড়ি টয়লেটের পাশে পাউডারের বোতল ঝুলিয়ে দিয়েছি।
৭। অসহায়, প্রতিবন্ধী কিংবা অসহায় যে কোন জায়গার মানুষদের সহযেগিতা করা।
এছাড়াও প্রভা ঢাকা, মিরপুর বসবাস করে। মিরপুর বুদ্দিজীবি কবরস্থানে প্রতিমাসে একবার করে পথ শিশুদের খাবার খাওয়ান সেটাও বিভিন্ন জনের থেকে ৩০ টাবা করে নিয়ে কাজটা করে থাকেন। মাঝেমধ্যে সে ভাবে লোকে তাকে কি না বলে কখনো বিরিআনি কখনো বাহিরের ফাষ্টফুড কিংবা ফলমূল কিনে নিয়ে তাদের মাঝে হাজির হন। তার প্রতি ওদের ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হন তিনি। চোখ ছলমল করে আর ভাবেন তার সন্তান ওয়ালিদ কতই না ভালো আছে। যখন যা চাচ্ছে তাই পাচ্ছে। যখন যা খাওয়ার খাচ্ছে কত আরাম আয়েশে দিন কাটায় অথচ ওরা একবেলা খেলে আরেক বেলা পায় না। লোকের কাছে হাত পাতে গালাগাল শোনতে হয় অনিহা করে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় অনেকে আরও অনেক কিছুই এই বাবনাগুলো প্রায়ই তাকে ভাবাতো। এই বাবনাগুলো তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওদেরকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে যদি ভালোভাবে ওদেরকে কাছে টেনে নিয়মিত যেতে পারতাম তবে ওদেরকে পথশিশু নাম বাদ দিয়ে “আলোর রেণু” নামে অবিহিত করতাম এমনটিই তার ভাবনা।

Print Friendly, PDF & Email
×

সারা বাংলা সারা দিন-এর সাথেই থাকুন!