সচেতন হই,সুস্থ থাকি এইডস মুক্ত দেশ গড়ি/মতামত

এইডস একটি ঘাতক ব্যাধি।প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুবরণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লসএঞ্জেলস-এ ১৯৮১ সালে সর্বপ্রথম এই রোগটি সনাক্ত করা হয়।সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগটি ছড়িয়ে পরে।১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ১লা ডিসেম্বরকে “বিশ্ব এইডস দিবস” হিসেবে ঘোষণা দেয়। প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি,এইচআইভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গিকার প্রকাশ ও আক্রান্তদের প্রতি সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে ১৯৮৮ সাল থেকেই সকল ইউএন সদস্যভুক্ত দেশসমুহে প্রতি বছর ১লা ডিসেম্বর যথাযথ মর্যাদার সহিত দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটিতে বিশ্বের ভিন্ন দেশে বহু অনুষ্ঠান-কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এইচআইভি-পজিটিভ মানুষ এবং এইডস-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে একাত্নতার জন্য বিশ্বব্যাপী “লালা ফিতার” একটি প্রতীক ব্যবহার করা হয়। চলতি বছর “বিশ্ব এইডস দিবস”-এর ৩২তম উদযাপন বার্ষিকি এবং এবছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে,”বিশ্ব সংহতি,ভাগ দায়িত্ব”।  “এইডস(acquired immunodeficiency syndrome)” বা “অর্জিত প্রতিরক্ষার অভাবজনিত রোগলক্ষণসমূহ” হচ্ছে “এইচ আই ভি(acquired immunodeficiency virus)” বা “মানব প্রতিরক্ষা অভাবসৃষ্টিকারী ভাইরাস” নামক ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ফলে সৃষ্ট একটি রোগ যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। মানুষের শরীরের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইকারী কোষগুলো এইচআইভি ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ফলে দুর্বল হয়ে যায় এবং চিকিৎসার অভাবে তা এইডস-এ রূপ লাভ করে। প্রতি বছর বিশ্বে এইডস নামক ঘাতক দ্বারা অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এইচআইভি ও এইডস পরিসংখ্যান ২০১৯ অনুসারে– বিশ্বব্যাপী ৩৮.০মিলিয়ন(৩১.৬মিলিয়ন-৪৪.৫মিলিয়ন) মানুষ এইচ আই ভি নিয়ে বাস করছে। ১.৭মিলিয়ন(১.২মিলিয়ন-২.২মিলিয়ন) মানুষ নতুন করে এইচ আই ভি তে আক্রান্ত হয়েছে এবং সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার ৬৯০ ০০০(৫০০ ০০০-৯৭০ ০০০)জন মানুষ এইডস সম্পর্কিত অসুস্থতায় মারা গিয়েছে। এইচআইভি ভাইরাস ছড়িয়ে পরার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ বিদ্যমানঃ ১.এইচআইভি আক্রান্ত কোন ব্যক্তির ব্যবহৃত ইঞ্জেকশনের সিরিজ ব্যবহার করা ও তার রক্ত গ্রহণের দ্বারা, ২.এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের থেকে গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে বা সন্তান প্রসবকালে সেই শিশু আক্রান্ত হতে পারে যদিও নির্ধারিত ঔষধ ব্যবহার করলে এর সম্ভাবনা কম থাকে, ৩.এইচআইভি আক্রান্ত কোন ব্যক্তির সাথে অবাধ বা অসংরক্ষিত যৌন মিলনের মাধ্যমে। কিন্তু এইচআইভির বিস্তার সম্বদ্ধে মানুষের মাঝে অনেক ভ্রান্ত ধারণার প্রচলণ আছে।অনেকেই এইচআইভিকে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক ভাইরাস হিসেবে মানে যদিও তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি ধারণা।বস্তুত শরীর জাত অধিকাংশ তরল ক্ষরণে এইচআইভি নিষ্কৃত হয় তবে স্নেহ পদার্থের আবরণ থাকায় এইচআইভি খুব ভঙ্গুর তাই শরীরের বাহিরে এটি বেশিক্ষণ বাঁচে না। কাজেই সরাসরি রক্ত বা যৌন নিঃসরন দেহে প্রবেশ না করলে এইচআইভি সংক্রমনের সম্ভাবনা খুব কম। এই ভাইরাসের কিছু লক্ষণ রয়েছে যেমন- অবসাদ,ক্রমান্বয়ে ওজন হ্রাস,দীর্ঘদিন যাবৎ জ্বর ও গলা ফুলতে শুরু করা,দেহের বিভিন্ন অংশে র‍্যাশ,দেহের বিভিন্ন অংশে ব্যথা এবং নারীদের ক্ষেত্রে মেন্সট্রুয়াল সাইকেলে পরিবর্তন লক্ষ্য করা ইত্যাদি রোগলক্ষণগুলো দেখা দিলে তা এইডস বলে গণ্য হবে। এইচআইভি আক্রান্তের স্বল্প সময়েই তা রোগে পরিণত হয় না বরং অনেক সময় আক্রান্ত হওয়ার  ১০-১৫ বছরেরও বেশি সময় পরে তা রোগে পরিণত হতে পারে।এইচআইভি মূলত ২ধরণের- এইভআইভি-১,যার ভিরুলেন্স ও সংক্রমন্যতা উভয়ই বেশি এবং এর ব্যাপ্তি বিশ্বব্যাপী এইচআইভি-২,যার ভিরুলেন্স অপেক্ষাকৃত কম,সংক্রমন্যতাও কম এবং এর ব্যাপ্তী পূর্ব আফ্রিকায়। খুব সামান্য হলেও বাংলাদেশেও এইডস আক্রান্ত রোগীদের অস্তিত্ব রয়েছে।বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে।বাংলাদেশে অধিকাংশ এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সিলেট,ঢাকা,চট্টগ্রাম ও খুলনায় এবং আক্রান্তদের বেশিরভাগই নারী-পুরুষ অভিবাসী শ্রমিক। ২০১৯ পর্যন্ত দেশে মোট ১৪,০০০ এইডস রোগী সনাক্ত করা গিয়েছে যার মধ্যে ২০১৯ সালেই ৯১৯জন এইডস রোগী শনাক্ত করা গিয়েছে যাদের ১০৫জনই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এই যে নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ১৭০জন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।বাংলাদেশ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস রোগ নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা হলেও বিভিন্ন কারণে দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা ধনাত্বক পর্যায়ে যা এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের পথে বাধাস্বরূপ।  এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে এই রোগের বিস্তার রোধ করা যায় এবং আক্রান্তদের সাথে আমাদের আচরণ কিরূপ হওয়া উচিত!  এই রোগের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধে মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে যা মানুষকে অনৈতিক শারীরিক মিলনের মতো অপরাধ থেকে দূরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী তাছাড়া প্রতিটি পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রকেও  সচেষ্ট হতে হবে। ইঞ্জেকশনের সিরিজ ব্যবহার ও রক্তের আদান-প্রদানের বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যাক্তিরা যারা একই ইঞ্জেকশনের সিরিজ ব্যবহারের দ্বারা মাদক সেবন করে তারাও এইডস ছড়ানোর পেছনে দায়ী তাই সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এইডস আক্রান্তদের প্রতি সকলকে আরও বিনয়ী হতে হবে। এইডস সম্বদ্ধে ভ্রান্ত ধারণা দুরীকরণের মাধ্যমে আক্রান্তদেরকে আমাদের সমাজেরই একটি অংশ হিসেবে ভাবতে হবে। চাকরি ক্ষেত্রে,শিক্ষা ক্ষেত্রে কোথাও তাদের সাথে কোন ধরনের অসামঞ্জস্য করা যাবে না। এইডস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ না হলেও এইডস মানেই যে মৃত্যু এটি একটি ভুল ধারণ। আমাদের আগে এটা জানতে হবে যে এইচআইভি মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে ফলে মানবদেহে মারাত্নক সংক্রামক রোগ দেখা দেয় যা পরে মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। এটি এইচআইভি ভাইরাসের প্রাথমিক একটি দিক। কিন্তু বর্তমানের উন্নত চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিক এই বিশ্বে এইডস এর মতো রোগের উপর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতিরও উদ্ভব হয়েছে। একজন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিও 

অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির দ্বারা দীর্ঘদিন বাঁচতে পারেন। এটি এমন একটি থেরাপি যার মধ্যে এইচআইভি ঔষধের সংমিশ্রণ জড়িত। এটি এইচআইভি নিরাময় করতে পারে না তবে এইচআইভি ঔষধগুলি এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে সহায়তা করে।

 সুতরাং আমাদের সবাইকে এইচআইভি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে বিশ্বটিকে এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য আরও বন্ধুত্বপূর্ণ করার প্রয়াস করতে হবে। এইচআইভি আক্রান্তদের সাথে অসম ও অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের আওয়াজ তুলে তাদের প্রতি মিত্রতার হাত বাড়াতে হবে। আমাদের এরূপ আচরণকেই আজকের এই বিশ্বকে প্রকৃতপক্ষে একটি মানবতাসম্পন্ন ও উদার বিশ্বে পরিণত করার অংশ বলেই গন্য করা যাবে। 

লেখকঃআতিয়া ফাইরুজ ঐশী 
শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email
×

সারা বাংলা সারা দিন-এর সাথেই থাকুন!